নিম দিয়ে নিরাময়

নিম এক মহা উপকারী উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম হল Azadirachta Indica. নিমের উপকারের কথা বলে শেষ করার মত নয়। প্রকৃতিতে ছড়িয়ে থাকা শত শত ঔষধি গাছের মধ্যে ঔষধিগুণে ভরপুর নিম একটি শ্রেষ্ট উদ্ভিদ। আমাদের আবহাওয়াতে খুব সহজেই নিম গাছ জন্মে। এই সহজপ্রাপ্যতার কারনেই নিমের কদর বা মুল্যায়ন আমাদের কাছে খুব বেশী নাই। যা কিছু মানুষ খুব সহজেই পেয়ে যায় তার মুল্যায়ন সে করে না। যেমন বেঁচে থাকার জন্য যে অক্সিজেন প্রতি মুহুর্তে আমরা পরিবেশ থেকে বিনামূল্যে গ্রহণ করছি তাও আবার পরিপূর্ণভাবে নিচ্ছি না। একজন শ্বাস-কষ্টের রোগীকে যখন হাসপাতালে অর্থের বিনিময়ে অক্সিজেন নিতে হয় তখনিই কেবল এই প্রাকৃতিক উপাদানের মহামুল্য বুঝতে পারা যায়। যাক আমাদের মুল প্রসঙ্গে আসা যাক।

Neem

প্রাচীনকাল থেকেই নিম তার বহুমুখী গুণ এবং উপকারীতার কারনে মানুষের কাছে বহল সমাদৃত। যে বাড়িতে নিম গাছ থাকে সে বাড়ির আবহাওয়া বিশুদ্ধ ও রোগবালই মুক্ত থাকে। সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় নিম অন্যান্য উদ্ভিদ অপেক্ষা সর্বাধিক পরিমাণ অক্সিজেন নির্গত করে। তাই পরিবেশ রক্ষায় নিম অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা পালন করে। আমাদের সকলের উচিৎ বাড়ির আশেপাশে কমপক্ষে একটি হলেও নিম গাছ লাগানো। আজ আমি মানব দেহে রোগ নিরাময়ে নিমের বহুল ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করব।

১. পেট ব্যাথা বা শুলঃ ১০ গ্রাম নিমের বীজ, ১০ গ্রাম শুঁঠ, ১০ গ্রাম তুলশীর পাতা এবং ৮-১০ টি গোল মরিচ মিশিয়ে ঘন চাটনির মত করে অল্প অল্প করে মাঝে মধ্যে চেটে খেতে দিলে পেটের ব্যাথায় নিশ্চিত উপকার লাভ হয়।

২. দাঁতের রোগঃ রোজ সকালে নিমের ডাল দিয়ে মেছওয়াক করলে দাঁত মজবুত এবং নিঃরোগ থাকে। দাঁত ঝকঝকে হয়। দন্তক্ষয় রোগ থেকে দাঁতকে সুরক্ষা করে।

৩. অজীর্ণঃ অজীর্ণ মানে হল খাবার সহজে হজম না হওয়া, পেট ভারী লাগা, কখনো কখনো টক ঢেঁকুর ওঠে, মাথা ধরে, জ্বরও আসে।

৪. ব্রণঃ নিম পোড়ানোর পর তার ছাই ক্রিম বা ভেসলিনের সাথে মিশিয়ে মুখে মাখলে ব্রণ-ফুস্কুড়ি ইত্যাদি নিরাময় হয়।

৫. চর্মরোগঃ চর্মরোগে নিমের ব্যবহার বহুল প্রচলিত এবং প্রাচীনকাল থেকেই এর ব্যবহার হয়ে আসছে। নিমের পাতা পানিতে সিদ্ধ করে সেই পানিতে গোসল করলে চর্মরোগ নিরাময় হয়। চুলকানি, ফোস্কা-ফুস্কুড়ি, খোস-পাচড়া হলে নিমের কচিপাতা এবং অল্প গোল মরিচ একসঙ্গে বেটে(সমপরিমাণে) প্রতিদিন সেবন করুন। পাচড়া শুকিয়ে এলে নিমপাতা দিয়ে ফোটানো জলে গোসল করুন এবং পাচড়াতে নিমের তেল লাগান।

৬. কৃমিঃ নিমের পাতার রস মধুতে মিশিয়ে চেটে খেলে পেটের কৃমি মরে যায়। মধু না থাকলে পরিবর্তে হিং মিশিয়ে খাওয়া যায়। শিশুরাই বেশিরভাগ কৃমিতে আক্রান্ত হয়। শিশুদের কৃমি নির্মূল করতে ৫০ মি.গ্রা. পরিমাণ নিম গাছের মূলের ছালের গুড়া দৈনিক ৩ বার কুসুম গরম পানি সহ খেতে হবে।

৭. উকুনঃ নিমের তেল প্রতিদিন মাথায় মাখলে মাথার উকুন মরে যায়। কম পক্ষে ৮ থেকে ১০ দিন মাখতে হবে।

৮. হাঁপানি ও কাশিঃ ১০ ফোঁটা নিমের তেল পানের ওপর দিয়ে খেলে হাঁপানি ও কাশিতে আরাম পাওয়া যায়।

৯. হাত-পায়ের জ্বালাঃ নিমের পাতা বেটে হাতে ও পায়ে তেলের মতো লেপন করলে হাত-পায়ের জ্বালা উপশম হয়।

১০. বমিঃ যদি অনবরত বমি হয় তাহলে ২৫ গ্রাম পরিমাণ নিমের পাতা বেটে নিয়ে তাতে ৫/৬ দানা গোল মরিচ মিশিয়ে আধ কাপ জলে গুলে একবারে পান করতে দিন। বমি বন্ধ হয়ে যাবে।

১১. পায়োরিয়াঃ পায়োরিয়া বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া রোগেও নিমের তেল খুব উপকারী। নিয়মিত কিছুদিন নিমের তেল দিয়ে মাড়ি মালিশ করলে এ রোগ সেরে যায়।

১২. পোকা-মাকড়নাশকঃ শুকনো নিমের পাতা পুড়িয়ে ঘরে ধোঁয়া দিলে মশা, মাছি এবং অন্যান্য পোকা-মাকড় দুর হয়।

১৩. নাসা রোগঃ নাক দিয়ে রক্ত পড়লে বা নাসা রোগ হলে নিমের ছাল পানি দিয়ে বেটে গাঢ় প্রলেপ তৈরি করুন। এই  প্রলেপ মাথায় লাগালে নাসা রোগ সেরে যায়।

১৪. প্রদর রোগঃ গরুর দুধের সঙ্গে নিমের তেল মিশিয়ে পান করলে প্রদর রোগ ভাল হয়। এছাড়া নিমের বীজ পানিতে ভিজিয়ে বেটে পুটলি করে যোনির ওপর রাখলে যোনির ব্যাথা নিরাময় হয়।

১৫. হৃদরোগঃ হৃদরোগীদের নিম পাতার নির্যাস খাওয়ালে উপকার পাওয়া যায়। এছাড়া ব্লাড প্রেসার এবং রক্তে ক্লোরেস্টোরলের পরিমাণ হ্রাস করে। রক্ত পাতলা করে, হার্টবিট কমায়।