কয়েকটি সাধারণ রোগের সহজ ভেষজ চিকিৎসা

সচরাচর দেখা যায় যে কোন সাধারণ রোগের বেলায়ও মানুষ কথায় কথায় ঔষধ সেবন করে থাকে। অথচ একটু সচেতন হলে বা জানা থাকলে হাতের কাছে পাওয়া খুব সাধারণ প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করেই এধরনের অনেক ছোট খাট শারীরিক সমস্যা সমুহ প্রতিকার করা সম্ভব। আসুন আজ আমরা জেনে নিই তেমন তিনটি সমস্যার সহজ প্রতিকারের উপায়।

পুরনো যেকোন ঘায়ের মলম তৈরী করুন নিজে :

৫০০ গ্রাম গাওয়া ঘিয়ের সঙ্গে ৫০ গ্রাম নিম পাতা মিশিয়ে একটি পাত্রে নিন। তারপর মিশ্রণটি চুলায় বসিয়ে গরম করুন। নিম পাতা কালচে বর্ণের হয়ে অাসলে পাত্রটি নামিয়ে পাতা ও ঘি একসাথে মেড়ে পেষ্ট বা মলমের মত করে তৈরী করুন। যে কোন পুরনো ঘা যা কোন ঔষধেই সারেনি তা এই প্রাকৃতিক মলম ব্যবহারে সেরে যাবে। প্রতিদিন ২ বার করে এই মলম লাগাতে হবে। এই মলম বহু পরীক্ষিত।

কাটা দাগ ও পোড়া দাগ দুর করার উপায় :

অনেক সময় কাটা বা পোড়া দাগ শরীরের বিভিন্ন স্থানের সৌন্দর্য নষ্ট করে। এধরনের দাগ দুর করতে নীচে কয়েকটি পদ্ধতি দেয়া হল:
১) চন্দন জলে ঘষে নিয়ে কাটা বা পোড়া দাগে লাগালে আশাতীত উপকার পাওয়া যায়।
২) প্রতিদিন একটা করে পাকা টমেটোর সাথে লেবুর রস লাগিয়ে সকাল-সন্ধ্যা দাগের স্থানে ঘষুন। কিছুক্ষন পর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এভাবে কয়েকদিন করলে ত্বক থেকে দাগ মিলিয়ে যায় এবং ত্বকের সৌন্দর্য ফিরে আসে।
৩) রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে দাগের স্থানে লেবুর রস লাগিয়ে ঘষুন এবং রস লাগিয়ে রেখে দিন। পরদিন সকালে ধুয়ে ফেলুন। এভাবে ১/২ সপ্তাহ করলে দাগ মিলিয়ে যাবে।

How to remove burn spot

দন্তশুল থেকে প্রতিকার :

Tooth Painদাঁতে যদি হঠাৎ যন্ত্রণা অারম্ভ হয় তাহলে আদার খোসা ছাড়িয়ে নিয়ে কুচকুচি করে ব্যাথার জায়গায় চিবালে এবং চুষলে যে কোন ধরনের দাঁতের ব্যাথা নিরাময় হয়। মনে রাখবেন আদা চিবাতে হবে দাঁত দিয়ে এবং ঐ রস এমনভাবে চুষতে হবে যাতে ব্যাথার দাঁতে রস লাগে।

নিম দিয়ে নিরাময়

নিম এক মহা উপকারী উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম হল Azadirachta Indica. নিমের উপকারের কথা বলে শেষ করার মত নয়। প্রকৃতিতে ছড়িয়ে থাকা শত শত ঔষধি গাছের মধ্যে ঔষধিগুণে ভরপুর নিম একটি শ্রেষ্ট উদ্ভিদ। আমাদের আবহাওয়াতে খুব সহজেই নিম গাছ জন্মে। এই সহজপ্রাপ্যতার কারনেই নিমের কদর বা মুল্যায়ন আমাদের কাছে খুব বেশী নাই। যা কিছু মানুষ খুব সহজেই পেয়ে যায় তার মুল্যায়ন সে করে না। যেমন বেঁচে থাকার জন্য যে অক্সিজেন প্রতি মুহুর্তে আমরা পরিবেশ থেকে বিনামূল্যে গ্রহণ করছি তাও আবার পরিপূর্ণভাবে নিচ্ছি না। একজন শ্বাস-কষ্টের রোগীকে যখন হাসপাতালে অর্থের বিনিময়ে অক্সিজেন নিতে হয় তখনিই কেবল এই প্রাকৃতিক উপাদানের মহামুল্য বুঝতে পারা যায়। যাক আমাদের মুল প্রসঙ্গে আসা যাক।

Neem

প্রাচীনকাল থেকেই নিম তার বহুমুখী গুণ এবং উপকারীতার কারনে মানুষের কাছে বহল সমাদৃত। যে বাড়িতে নিম গাছ থাকে সে বাড়ির আবহাওয়া বিশুদ্ধ ও রোগবালই মুক্ত থাকে। সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় নিম অন্যান্য উদ্ভিদ অপেক্ষা সর্বাধিক পরিমাণ অক্সিজেন নির্গত করে। তাই পরিবেশ রক্ষায় নিম অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা পালন করে। আমাদের সকলের উচিৎ বাড়ির আশেপাশে কমপক্ষে একটি হলেও নিম গাছ লাগানো। আজ আমি মানব দেহে রোগ নিরাময়ে নিমের বহুল ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করব।

১. পেট ব্যাথা বা শুলঃ ১০ গ্রাম নিমের বীজ, ১০ গ্রাম শুঁঠ, ১০ গ্রাম তুলশীর পাতা এবং ৮-১০ টি গোল মরিচ মিশিয়ে ঘন চাটনির মত করে অল্প অল্প করে মাঝে মধ্যে চেটে খেতে দিলে পেটের ব্যাথায় নিশ্চিত উপকার লাভ হয়।

২. দাঁতের রোগঃ রোজ সকালে নিমের ডাল দিয়ে মেছওয়াক করলে দাঁত মজবুত এবং নিঃরোগ থাকে। দাঁত ঝকঝকে হয়। দন্তক্ষয় রোগ থেকে দাঁতকে সুরক্ষা করে।

৩. অজীর্ণঃ অজীর্ণ মানে হল খাবার সহজে হজম না হওয়া, পেট ভারী লাগা, কখনো কখনো টক ঢেঁকুর ওঠে, মাথা ধরে, জ্বরও আসে।

৪. ব্রণঃ নিম পোড়ানোর পর তার ছাই ক্রিম বা ভেসলিনের সাথে মিশিয়ে মুখে মাখলে ব্রণ-ফুস্কুড়ি ইত্যাদি নিরাময় হয়।

৫. চর্মরোগঃ চর্মরোগে নিমের ব্যবহার বহুল প্রচলিত এবং প্রাচীনকাল থেকেই এর ব্যবহার হয়ে আসছে। নিমের পাতা পানিতে সিদ্ধ করে সেই পানিতে গোসল করলে চর্মরোগ নিরাময় হয়। চুলকানি, ফোস্কা-ফুস্কুড়ি, খোস-পাচড়া হলে নিমের কচিপাতা এবং অল্প গোল মরিচ একসঙ্গে বেটে(সমপরিমাণে) প্রতিদিন সেবন করুন। পাচড়া শুকিয়ে এলে নিমপাতা দিয়ে ফোটানো জলে গোসল করুন এবং পাচড়াতে নিমের তেল লাগান।

৬. কৃমিঃ নিমের পাতার রস মধুতে মিশিয়ে চেটে খেলে পেটের কৃমি মরে যায়। মধু না থাকলে পরিবর্তে হিং মিশিয়ে খাওয়া যায়। শিশুরাই বেশিরভাগ কৃমিতে আক্রান্ত হয়। শিশুদের কৃমি নির্মূল করতে ৫০ মি.গ্রা. পরিমাণ নিম গাছের মূলের ছালের গুড়া দৈনিক ৩ বার কুসুম গরম পানি সহ খেতে হবে।

৭. উকুনঃ নিমের তেল প্রতিদিন মাথায় মাখলে মাথার উকুন মরে যায়। কম পক্ষে ৮ থেকে ১০ দিন মাখতে হবে।

৮. হাঁপানি ও কাশিঃ ১০ ফোঁটা নিমের তেল পানের ওপর দিয়ে খেলে হাঁপানি ও কাশিতে আরাম পাওয়া যায়।

৯. হাত-পায়ের জ্বালাঃ নিমের পাতা বেটে হাতে ও পায়ে তেলের মতো লেপন করলে হাত-পায়ের জ্বালা উপশম হয়।

১০. বমিঃ যদি অনবরত বমি হয় তাহলে ২৫ গ্রাম পরিমাণ নিমের পাতা বেটে নিয়ে তাতে ৫/৬ দানা গোল মরিচ মিশিয়ে আধ কাপ জলে গুলে একবারে পান করতে দিন। বমি বন্ধ হয়ে যাবে।

১১. পায়োরিয়াঃ পায়োরিয়া বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া রোগেও নিমের তেল খুব উপকারী। নিয়মিত কিছুদিন নিমের তেল দিয়ে মাড়ি মালিশ করলে এ রোগ সেরে যায়।

১২. পোকা-মাকড়নাশকঃ শুকনো নিমের পাতা পুড়িয়ে ঘরে ধোঁয়া দিলে মশা, মাছি এবং অন্যান্য পোকা-মাকড় দুর হয়।

১৩. নাসা রোগঃ নাক দিয়ে রক্ত পড়লে বা নাসা রোগ হলে নিমের ছাল পানি দিয়ে বেটে গাঢ় প্রলেপ তৈরি করুন। এই  প্রলেপ মাথায় লাগালে নাসা রোগ সেরে যায়।

১৪. প্রদর রোগঃ গরুর দুধের সঙ্গে নিমের তেল মিশিয়ে পান করলে প্রদর রোগ ভাল হয়। এছাড়া নিমের বীজ পানিতে ভিজিয়ে বেটে পুটলি করে যোনির ওপর রাখলে যোনির ব্যাথা নিরাময় হয়।

১৫. হৃদরোগঃ হৃদরোগীদের নিম পাতার নির্যাস খাওয়ালে উপকার পাওয়া যায়। এছাড়া ব্লাড প্রেসার এবং রক্তে ক্লোরেস্টোরলের পরিমাণ হ্রাস করে। রক্ত পাতলা করে, হার্টবিট কমায়।

অসময়ে চুল পাকা রোধ করুন প্রাকৃতিক চিকিৎসায়

একটি নির্দিষ্ট বয়সকালে সব মানুষেরই চুল পাকা শুরু হয়। কারো কারো ক্ষেত্রে কম বয়সে আবার কারো কারো ক্ষেত্রে একটু বেশী বয়সে চুল পাকা শুরু হতে পারে এবং এটি কোন রোগ নয়। কিন্তু যে বয়সে চুল পাকার কথা তার আগেই কারো চুল পাকলে সেটা স্বাভাবিকতার পর্যায়ে পড়ে না। যেমন ২০, ২৫ কিংবা ৩০ বছর বয়সে চুল পাকাটা স্বাভাবিক চুল পাকা নয়, বরং এটি একটি রোগ। খুব সহজেই প্রাকৃতিক কিছু উপাদান সঠিক নিয়মে ব্যবহার করে এই সমস্যা থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া যায়। আসুন তাহলে জেনে নিই এর উপায় :

Natural grey hair treatment

চিকিৎসাঃ
১) এক চামচ আমলকী চূর্ণ এক কাপ পানির সাথে মিশিয়ে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার ঠিক পূর্বে নিয়মিত খেলে অসময়ে চুল পাকা বন্ধ হয়। চেহারায় লাবণ্য ফিরে আসে। গলার স্বর বিশুদ্ধ ও মিষ্টি হয়। স্বরভঙ্গ থাকলে তা দুর হয়ে যায়।

২) শুকনো আমলকীর গুঁড়ো পানিতে মিশিয়ে পেষ্ট তৈরী করে তা মাথায় প্রলেপ দিয়ে ৫ থেকে ১০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলতে হবে। এই নিয়মে সপ্তাহে ২ দিন স্নানের পূর্বে কমপক্ষে তিন মাস লাগালে অসময়ে চুল পাকা রোধ করা সম্ভব।

৩) আমলকীর জলে নিয়মিত মাথা ধুলে অসময়ে চুল সাদা হওয়া বন্ধ হয়। ২৫ গ্রাম শুকনো আমলকী মোটা মোটা করে ভেঙ্গে নিয়ে ২৫০ গ্রাম পানিতে রাতে ভিজিয়ে রেখে পরদিন সকালে হাত দিয়ে ভালো করে কচলিয়ে নিয়ে সমস্ত পানি একটা পরিস্কার কাপড়ে ছেঁকে নিন। তারপর থিতিয়ে গেলে ঐ পানি নিয়ে চুলের গোড়ায় ভালো করে মালিশ করুন ঘষে লাগান। ১৫/২০ মিনিট পর সাধারন পানিতে মাথা ধুয়ে ফেলুন। চুল রুক্ষ্ম হলে সপ্তাহে একবার এবং চিকন চুল হলে সপ্তাহে ২ বার এভাবে আমলকীর জল মাথায় মালিশ করবেন। প্রয়োজনে দিন কয়েক রোজ ধুতে পারেন। এছাড়া চুল ধোয়ার নির্দিষ্ট দিনের পূর্বের দিন রাতে মাথায় আমলার তেল মালিশ করলে আরও ভালো ফল পাওয়া যায়।